Senior Section

পরিবর্তন

সত্য প্রসাদ মুখার্জী

কত ভালো ছিল সেই ছেলেবেলার দিনগুলো|
কত ফড়িঙের পিছনে ছুটোছুটি,
কত প্রজাপতির পিছনে ছোটাছুটি,
কত কাঁচপোকা ধরে দেশলাই এর বাক্সে
বন্দি করে রাখা,
কত খোলামকুচি দিয়ে পুকুরের জলে
ব্যাঙ খেলা, কত নির্জন পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে
মাছের ফুটকাটা দেখা
কত আকাশের রামধনু দেখে,
আনন্দে হাততালি দিয়ে ওঠা,
কত গোলাপের পাপড়ি বইয়ের পাতার ভাঁজে
লুকিয়ে রাখা –
গন্ধ নেই, তবুও মাঝে মাঝে
তার গন্ধ শোঁকা |
যা কিছু করি সবেতেই আনন্দ |
তারই স্মৃতি নিয়ে রাত্রে ঘুমিয়ে পড়া|
কত ভালো ছিল সেই দিনগুলো !
আজো আকাশে রামধনু ওঠে,
সাতটি রঙের একটাও কম নেই,
আজো গোলাপ তেমনই সুন্দর,
কিন্তু, আমি তা দেখে আর
আনন্দ পাইনা ।
আমি বস্তুবাদী জীব, টিভি র পর্দায়
পে কমিশন এর রিপোর্ট দেখে
আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠি –
যাক কিছু পাওয়া যাবে তাহলে!
বয়েসের সাথে সাথে, আনন্দ বোধের
ধারাটাও পাল্টে গেছে ।

  প্রবীণ কবি,
সেদিনগুলি হারায়নিতো !
সঙ্গে আছে,
আজীবনের মনের খাতায়,
রং বেরঙের ছবির মাঝে ।।যে পূজা আজ করছি সবাই
সে পূজা হয় তিথি মেনে ।
আসেও, আবার যায় ফুরিয়ে ।।
যদিও সেটাও ফুরায় না ঠিক
এর কথাটি ভাববে বসে অন্য প্রবীণ,
আজকে নেহাত ছোট্টটি যে!তোমার পূজা, ইচ্ছে পূজা,
কল্পনা-রস, সুখস্মৃতি
মজিয়ে রাখে,
যেখানে চাও, যখনটি চাও
প্রাণভরে তার আনন্দ নাও
যখন ইচ্ছে রোমন্থনে
আপন মনে ।।মনের পাতায় হারানো দিন,
রামধনু রং স্বপ্ন রঙিন ।
পুকুর জলে ব্যাঙ লাফানি,
বইয়ের পাতায় পাপড়িখানি
এই তো সেদিন!তোমার পূজা পরিক্রমায়
আমায় যদি করো সামিল
আমিও দেখি তোমার চোখে
অন্য দিনের, অন্য পূজা
বুক ভরে নিই সতেজ নিশাস
পূজার ছুটি, ঘাসবনে কাশ
মাঝ দুপুরে বন্ধু কজন
কলার ভেলা, জলেতে ঝাপ
মাটির গন্ধ, নতুন জামা
ফুলের মালা, হিমেল বাতাস
ধূপের ধোয়া, ঢাকেতে বোল
পূজার মন্ত্র শান্তির জল,
কার পরশে কর্পুরে তাপ?
কাঠের থালায় প্রসাদী ফল
জিভ, নাকি মন কোথায় লেগে,
তিলের নাড়ু, খৈয়ের মোয়া
পে-কমিশন থাকনা তোলা
তোমার মায়ের স্নেহের ছোওয়া
দেবে আমায়, প্রবীণ কবি?
আশীর্বাদি?

– অভীক সেনগুপ্ত ।।

তর্পণ তিথি

গৌরী মৃণাল

এ বাড়ীর চিলেকোঠা ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয়,
তিন দিকে জানালা –
খুলে দিলে সমস্ত আকাশ যেন হৈ করে উঠতো,
চলে আসতো বুকের কাছে।
আমার দাদানের কথা মনে পড়ে-
দরাজ কণ্ঠ, ঋজু শরীর আর প্রশস্ত হৃদয়…
দাদান ছিল ওই আকাশের আয়না ।
ভোরবেলা আমার ঠামি যখন এলোচুলে
পূজোর ঘর থেকে বেরিয়ে আসতো,
আমি বলতাম-ঠামি, তোমার কপালে রোজ সূর্য ওঠে?
মা থাকতেন তাঁর নিজস্ব জগতে,
সুরের সংসারে, গানঘরে।
আশাবরীতে আলাপ, বেহাগে বিস্তার, আর
গভীর রাতের আকাশে আকুল দরবারী
অশ্রান্ত ঝালায় ঝরে যেত মায়ের স্পর্শে।
বাবা ছিলেন গবেষণার বৃত্তে আত্মমগ্ন,
কিন্তু ফেরাতেন না কাউকে –
মামা, পিসী, কাকা…
চালচিত্রে জমজমাট ছিল এই বাড়ি, এই সংসার,
….. একদিন ।
কত যুগ পরে সেই পিতৃপক্ষ ফিরে এল বুঝি
এই প্রবাসী শরীর আর উপবাসী হৃদয়ের কাছে।
পরিযায়ী ঠিকানায় উড়ে যাওয়া পাখি
মাস্তুল নেবে কি চিনে ম্লান গোধূলিতে?
সব কিছু থাকে, সব কিছু আছে,
তবু খুঁজে খুঁজে ফিরি, সেই আলো
দীপ থেকে দীপে বহমান –
শেষ কথা জেনেছে কি কেউ, কোথাও, কখনো?
অনন্ত ছায়াপথ জুড়ে
অঞ্জলি পেতে রাখে কোন্ নভোচারী
উত্তরপুরুষের কাছে?
অলক্ষ্যে কোথায় বাজে সেই মন্দ্রস্বর –
” আব্রম্ভভুবনল্লোকাঃ দেবর্ষি পিতৃমানবাঃ
তৃপ্যন্তু পিতরঃ……তৃপ্যন্তু ভুবনত্রয়ম্”।
তর্পণের মণ্ত্র …… আজ মহালয়া ।
স্থিতজানু হয়ে যাই,
জীবনের স্রোত ভরে নিই গণ্ডূষে, আর একবার-
যে আছে যেখানে, যা থাকে যেখানে,
শান্ত হয়ে যাক্, তৃপ্ত হোক্ তৃষ্ণা যতো হৃদয়ের খাঁজে।
অমরাবতীর সীমা ছুঁয়ে
নিরাবিল হোক্ আজ প্রাণের আবাস –
আজ তৃপ্যন্তু ভুবনত্রয়ম্ ।।